লিখেছেন: একজন ইতিহাস ও সংস্কৃতি গবেষক
বাঙালি জাতির নিজস্ব বর্ষপঞ্জি বা বঙ্গাব্দ কেবল তারিখ গণনার একটি মাধ্যম নয়; এটি বাংলার কৃষি, সংস্কৃতি, এবং ইতিহাসের এক অনন্য সংশ্লেষণ। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী এই ক্যালেন্ডারটি শতাব্দী ধরে হিন্দু, বৌদ্ধ, ইসলামি এবং মুঘল ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে আজকের রূপ পেয়েছে।
১. বঙ্গাব্দের প্রাচীন উৎস ও রাজা শশাঙ্ক
বাংলায় মুসলিম শাসনের আগে এই অঞ্চলে মূলত শকাব্দ এবং বিক্রমী (Bikrami) ক্যালেন্ডার প্রচলিত ছিল। প্রাচীন শিলালিপি থেকে জানা যায় যে, বিক্রমী ক্যালেন্ডার রাজা বিক্রমাদিত্যের নামানুসারে খ্রিস্টপূর্ব ৫৭ অব্দে (57 BCE) শুরু হয়েছিল।
তবে আধুনিক বাংলা সনের শুরু ধরা হয় ৫৯৩-৫৯৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে। অনেক ঐতিহাসিকের মতে, বাংলার প্রথম স্বাধীন নরপতি রাজা শশাঙ্ক ৫৯৪ খ্রিস্টাব্দে তাঁর সিংহাসন আরোহণ উপলক্ষে এই বর্ষপঞ্জির সূচনা করেন। মুঘল আমলের অনেক আগের মন্দির লিপিতে 'বঙ্গাব্দ' শব্দের উপস্থিতি এই মতবাদকে শক্তিশালী করে।
২. জ্যোতির্বিজ্ঞান ও প্রাচীন প্রভাব
বাংলা ক্যালেন্ডারের গাণিতিক ভিত্তি রচিত হয়েছে প্রাচীন ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যা বা জ্যোতিষ শাস্ত্রের ওপর, যা বেদাঙ্গের অন্যতম অংশ। এটি মূলত সূর্য সিদ্ধান্ত (Surya Siddhanta) এবং আর্যভট্টীয় (Aryabhatiya)-এর মতো সংস্কৃত গ্রন্থের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। প্রাচীন পাল রাজবংশের শাসনামলে 'আশ্বিন' মাসের মতো সংস্কৃত নামগুলো নথিপত্রে পাওয়া যায়, যা বর্তমান বাংলা ক্যালেন্ডারেও সংরক্ষিত আছে।
৩. মুঘল সংস্কার: সম্রাট আকবর ও ফসলি সন
বাংলা ক্যালেন্ডারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মোড় আসে মুঘল সম্রাট আকবরের শাসনামলে (১৫৫৬-১৬০৫ খ্রিস্টাব্দ)। তৎকালীন সময়ে মুঘল প্রশাসনে ইসলামি হিজরি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী খাজনা আদায় করা হতো। হিজরি বর্ষ চন্দ্রনির্ভর হওয়ায় সৌর বছরের চেয়ে প্রায় ১১ দিন কম হয়, যার ফলে ফসল কাটার সময়ের সাথে কর আদায়ের সময় মিলত না।
এই সমস্যার সমাধানে ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে আকবর তাঁর রাজকীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতুল্লাহ শিরাজীকে একটি সমন্বিত ক্যালেন্ডার তৈরির নির্দেশ দেন।
- তারিখ-ই-ইলাহি: এটি হিজরি এবং হিন্দু সৌর সনের সমন্বয়ে তৈরি হয়।
- ফসলি সন: একে ‘ফসলি সন’ বা শস্য ক্যালেন্ডারও বলা হতো।
- শুরুর বছর: আকবরের সিংহাসন আরোহণের বছর (১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ) থেকে এই ক্যালেন্ডারের হিসাব শুরু হয়।
পরবর্তীতে নবাব মুর্শিদ কুলি খান এই ক্যালেন্ডারকে ভূমি রাজস্ব আদায়ের প্রধান ভিত্তি হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন এবং 'পুণ্যাহ' (খাজনা আদায়ের উৎসব) প্রবর্তন করেন।
৪. আধুনিক সংস্কার: ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও বাংলাদেশ
ঐতিহ্যবাহী বাংলা ক্যালেন্ডারে মাসের দিন সংখ্যায় কোনো নির্দিষ্টতা ছিল না, যা আধুনিক প্রশাসনিক কাজে সমস্যা তৈরি করত। এই সমস্যা সমাধানে ১৯৬৬ সালে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে একটি সংস্কার কমিটি গঠন করা হয়।
প্রধান সংস্কারসমূহ:
- বছরের প্রথম ৫ মাস (বৈশাখ থেকে ভাদ্র) হবে ৩১ দিনের।
- পরবর্তী ৭ মাস হবে ৩০ দিনের।
- অধিবর্ষে (Leap Year) ফাল্গুন মাস হবে ৩১ দিনের।
বাংলাদেশ সরকার ১৯৮৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ক্যালেন্ডার গ্রহণ করে। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে আরও কিছু সূক্ষ্ম পরিবর্তন এনে আন্তর্জাতিক তারিখের সাথে এর সামঞ্জস্য করা হয়।
৫. বাংলা ক্যালেন্ডারের গঠন ও বিন্যাস
বাংলা ক্যালেন্ডারে ১২টি মাস এবং ৬টি ঋতু রয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ব্যবহৃত ক্যালেন্ডারের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য আছে। বাংলাদেশে এটি সম্পূর্ণ সৌরভিত্তিক, আর ভারতে এটি মূলত সূর্য সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করে তৈরি চন্দ্র-সৌর পদ্ধতি।
| মাসের নাম | দিন সংখ্যা (আধুনিক) | ঋতু | ইংরেজি মাস (আংশিক) |
|---|---|---|---|
| বৈশাখ | ৩১ দিন | গ্রীষ্মকাল | এপ্রিল-মে |
| জ্যৈষ্ঠ | ৩১ দিন | মে-জুন | |
| আষাঢ় | ৩১ দিন | বর্ষাকাল | জুন-জুলাই |
| শ্রাবণ | ৩১ দিন | জুলাই-আগস্ট | |
| ভাদ্র | ৩১ দিন | শরৎকাল | আগস্ট-সেপ্টেম্বর |
| আশ্বিন | ৩১ দিন | সেপ্টেম্বর-অক্টোবর | |
| কার্তিক | ৩০ দিন | হেমন্তকাল | অক্টোবর-নভেম্বর |
| অগ্রহায়ণ | ৩০ দিন | নভেম্বর-ডিসেম্বর | |
| পৌষ | ৩০ দিন | শীতকাল | ডিসেম্বর-জানুয়ারি |
| মাঘ | ৩০ দিন | জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি | |
| ফাল্গুন | ৩০ বা ৩১ দিন | বসন্তকাল | ফেব্রুয়ারি-মার্চ |
| চৈত্র | ৩০ দিন | মার্চ-এপ্রিল |
৬. সপ্তাহ ও বারসমূহের নামকরণ
বাংলা ক্যালেন্ডারে সপ্তাহের ৭টি বারের নাম প্রাচীন জ্যোতির্বিদ্যার সাতটি গ্রহ বা জ্যোতিষ্কের নামানুসারে রাখা হয়েছে:
| দিনের নাম (বাংলা) | Romanization | দেবতা / গ্রহ | Day name (English) | Day name (Sylheti) | Day name (Rohingya) |
|---|---|---|---|---|---|
| রবিবার / রোববার | Rôbibar / Robbar | সূর্য (রবি) | Sunday | Roibbár | Rooibar |
| সোমবার | Shombar | চন্দ্র (সোম) | Monday | Shombár | Cómbar |
| মঙ্গলবার | Mônggôlbar | মঙ্গল গ্রহ | Tuesday | Mongolbár | Mongolbar |
| বুধবার | Budhbar | বুধ গ্রহ | Wednesday | Budbár | Buidbar |
| বৃহস্পতিবার | Brihôspôtibar | বৃহস্পতি গ্রহ | Thursday | Bishudbár | Bicíbbar |
| শুক্রবার | Shukrôbar | শুক্র গ্রহ | Friday | Shukkurbár | Cúkkurbar |
| শনিবার | Shônibar | শনি গ্রহ | Saturday | Shonibár | Cónibar |
৭. সাংস্কৃতিক গুরুত্ব ও উৎসব
বাংলা বর্ষপঞ্জি বাঙালির জীবনের প্রতিটি উৎসবের নিয়ন্ত্রক। বছরের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ জাতীয় উৎসব হিসেবে পালিত হয়। এর সাথে যুক্ত রয়েছে:
- হালখাতা: ব্যবসায়ীদের নতুন হিসাব খাতা খোলা।
- মঙ্গল শোভাযাত্রা: ইউনেস্কো কর্তৃক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত।
- পহেলা ফাল্গুন: বসন্ত বরণ উৎসব।
- নবান্ন: নতুন ধান কাটার উৎসব।
উপসংহার
বাংলা ক্যালেন্ডার কেবল একটি গাণিতিক হিসাব নয়, বরং এটি বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস ও লড়াইয়ের প্রতীক। প্রাচীন রাজাদের ঐতিহ্য থেকে শুরু করে মুঘলদের প্রশাসনিক সংস্কার এবং আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক সংশোধন—সব মিলিয়ে বঙ্গাব্দ বাঙালির এক অনন্য সম্পদ। আজও এটি আমাদের আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে টিকে আছে।