বাংলাদেশের ১২ মাস - The 12 months of the Bengali calendar

বাংলাদেশে বাংলা ক্যালেন্ডার অনুসরণ করা হয়, যাকে বাংলা পঞ্জিকা বা বঙ্গাব্দও বলা হয়। এটি একটি সৌর ক্যালেন্ডার যা অঞ্চলের ইতিহাস, কৃষি এবং সংস্কৃতির সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ১২টি মাস নিয়ে গঠিত এই ক্যালেন্ডারটি ছয়টি স্বতন্ত্র ঋতুতে বিভক্ত, যা উৎসব, ঐতিহ্য এবং দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করে। বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের বিপরীতে, বাংলা ক্যালেন্ডারটি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় সৌর বছরের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা ঋতুগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করে।

এই নির্দেশিকায় বাংলা ক্যালেন্ডারের ইতিহাস, গঠন, ঋতু এবং সাংস্কৃতিক গুরুত্ব বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। ঐতিহাসিক সংস্কার এবং ঐতিহ্যগত অনুশীলনের ভিত্তিতে এটি একটি প্রামাণ্য বিবরণ প্রদান করে।

বাংলা ক্যালেন্ডারের ইতিহাস

বাংলা ক্যালেন্ডারের উৎপত্তি বাংলা অঞ্চলে এবং মুঘল যুগে এটি আনুষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। সম্রাট আকবর ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে (তারিখ-ই-ইলাহি বা ফসলি ক্যালেন্ডার নামে পরিচিত) একটি সংস্করণ চালু করেন, যা কর সংগ্রহকে ফসল তোলার মৌসুমের সাথে সামঞ্জস্য করার জন্য সৌর ও চান্দ্র উপাদানের সমন্বয় ঘটায়।

মাসের নামগুলো সূর্য সিদ্ধান্তের মতো প্রাচীন গ্রন্থে উল্লিখিত নক্ষত্র (চান্দ্র মণ্ডল) থেকে উদ্ভূত। বাংলাদেশে ১৯৬৬ সালে বাংলা একাডেমির ভাষাবিদ মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে একটি কমিটি এটি সংস্কার করে এবং ১৯৮৭ সালে পুরোপুরি কার্যকর করে। এটি একটি সম্পূর্ণ সৌর ক্যালেন্ডারে পরিণত হয় যার মাসের দৈর্ঘ্য নির্দিষ্ট, যা ভারতের কিছু অংশে ব্যবহৃত ঐতিহ্যবাহী চান্দ্র-সৌর সংস্করণ থেকে আলাদা।

বঙ্গাব্দ (BS) পহেলা বৈশাখের (বাংলা নববর্ষ, ১৪ এপ্রিল) পর গ্রেগরিয়ান বছরের থেকে প্রায় ৫৯৩-৫৯৪ বছর পিছিয়ে থাকে। দিন সূর্যোদয় থেকে শুরু হয় এবং সপ্তাহে সাতটি দিন আছে যাদের নাম খগোলীয় বস্তুর নামে।

বাংলাদেশের ছয় ঋতু

বাংলা ক্যালেন্ডার বছরকে ছয় ঋতুতে (ঋতু) বিভক্ত করে, প্রতিটি ঋতু দুটি মাসব্যাপী। এই ঋতুগুলো বাংলাদেশের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় মৌসুমী জলবায়ুকে প্রতিফলিত করে এবং কবিতা, সঙ্গীত ও শিল্পকে অনুপ্রাণিত করে, বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনায়।

  • গ্রীষ্ম: গরম ও শুষ্ক
  • বর্ষা: বৃষ্টিপ্রবণ ও আর্দ্র
  • শরৎ: পরিষ্কার আকাশ ও মৃদু আবহাওয়া
  • হেমন্ত: ফসল তোলার মৌসুম
  • শীত: শীতল ও কুয়াশাচ্ছন্ন
  • বসন্ত: ফুলের সমারোহ ও উৎসব
ষড়ঋতুর বিস্তারিত বর্ণনা

১২টি মাস: নাম, তারিখ, ঋতু এবং গুরুত্ব

নিচে বাংলাদেশের সংশোধিত বাংলা ক্যালেন্ডারের ১২টি মাসের বিস্তারিত তালিকা দেওয়া হলো, যাতে গ্রেগরিয়ান তারিখের আনুমানিক সময়, ঋতু, দিনের সংখ্যা এবং সাংস্কৃতিক বিশেষত্ব অন্তর্ভুক্ত।

ক্রমমাসের নামগ্রেগরিয়ান তারিখ (আনুমানিক)ঋতুদিনপ্রধান উৎসব ও গুরুত্ব
বৈশাখ (বৈশাখ)মধ্য এপ্রিল থেকে মধ্য মেগ্রীষ্ম৩১পহেলা বৈশাখ (বাংলা নববর্ষ, ১ বৈশাখ/১৪ এপ্রিল) - সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক উৎসব, শোভাযাত্রা, সঙ্গীত এবং ঐতিহ্যবাহী খাবার।
জ্যৈষ্ঠ (জ্যৈষ্ঠ)মধ্য মে থেকে মধ্য জুনগ্রীষ্ম৩১তীব্র গ্রীষ্মের তাপ; কৃষি প্রস্তুতি শুরু।
আষাঢ় (আষাঢ়)মধ্য জুন থেকে মধ্য জুলাইবর্ষা৩১মৌসুমী বৃষ্টির শুরু; ধান চাষের জন্য জমি প্লাবিত হয়।
শ্রাবণ (শ্রাবণ)মধ্য জুলাই থেকে মধ্য আগস্টবর্ষা৩১প্রচুর বৃষ্টিপাত; বৃষ্টি নিয়ে লোকসঙ্গীত।
ভাদ্র (ভাদ্র)মধ্য আগস্ট থেকে মধ্য সেপ্টেম্বরশরৎ৩১পরিষ্কার আকাশ; জন্মাষ্টমী উদযাপন।
আশ্বিন (আশ্বিন)মধ্য সেপ্টেম্বর থেকে মধ্য অক্টোবরশরৎ৩১দুর্গাপূজা - হিন্দু সম্প্রদায়ের বড় উৎসব, অলঙ্কৃত প্রতিমা ও উদযাপন।
কার্তিক (কার্তিক)মধ্য অক্টোবর থেকে মধ্য নভেম্বরহেমন্ত৩০বর্ষার অবসান; লক্ষ্মীপূজা।
অগ্রহায়ণ (অগ্রহায়ণ)মধ্য নভেম্বর থেকে মধ্য ডিসেম্বরহেমন্ত৩০নবান্ন (নতুন ধানের উৎসব)।
পৌষ (পৌষ)মধ্য ডিসেম্বর থেকে মধ্য জানুয়ারিশীত৩০পৌষ সংক্রান্তি; পিঠে-পুলির মৌসুম।
১০মাঘ (মাঘ)মধ্য জানুয়ারি থেকে মধ্য ফেব্রুয়ারিশীত৩০শীতল আবহাওয়া; কিছু অঞ্চলে মাঘ বিহু-জাতীয় উদযাপন।
১১ফাল্গুন (ফাল্গুন)মধ্য ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্য মার্চবসন্ত৩০ (লিপ ইয়ারে ৩১)পহেলা ফাল্গুন (বসন্ত উৎসব); উজ্জ্বল রং ও ফুল।
১২চৈত্র (চৈত্র)মধ্য মার্চ থেকে মধ্য এপ্রিলবসন্ত৩০বছরের শেষ; কিছু অঞ্চলে চড়ক পূজা।

বাংলাদেশের বাংলা ক্যালেন্ডারের ১২ মাসের বিস্তারিত বর্ণনা

বৈশাখ

বৈশাখ বাংলা বর্ষের প্রথম মাস এবং গ্রীষ্ম ঋতুর শুরু। এই মাসটি বাঙালি সংস্কৃতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এর প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ হিসেবে বাংলা নববর্ষ উদযাপিত হয়। এটি বাঙালির সবচেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িক উৎসব, যেখানে মঙ্গল শোভাযাত্রা (ইউনেস্কোর অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত), রমনা বটমূলে ছায়ানটের গান, ব্যবসায়ীদের হালখাতা, গ্রামে গ্রামে মেলা এবং ঐতিহ্যবাহী খাবার যেমন পান্তা ভাত, ইলিশ মাছ, মিষ্টি উপভোগ করা হয়। এই উৎসব পুরনো বছরের দুঃখ ভুলে নতুন বছরের শুভ সূচনা এবং বাঙালি ঐক্যের প্রতীক। গ্রীষ্মের শুরু হলেও উৎসবের আনন্দে প্রকৃতি যেন নতুন রূপে সেজে ওঠে।

জ্যৈষ্ঠ

জ্যৈষ্ঠ বাংলা ক্যালেন্ডারের দ্বিতীয় মাস এবং গ্রীষ্ম ঋতুর শেষ পর্যায়। এই মাসে তাপমাত্রা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায় এবং কালবৈশাখী ঝড় প্রায়ই দেখা যায়। তবে এই মাসটি ফলের প্রাচুর্যের জন্য বিখ্যাত—আম, লিচু, জাম, কাঁঠাল, তরমুজের মতো গ্রীষ্মকালীন ফল বাজারে ভরে ওঠে, তাই একে 'মধুমাস' বলা হয়। গ্রামে ফল বাগানে কর্মব্যস্ততা বাড়ে, মানুষ ফল কিনে উপভোগ করে। তীব্র গরম সত্ত্বেও এই ফলের সমারোহ মানুষের মনে আনন্দ এনে দেয়। কৃষকরা বর্ষার জন্য জমি প্রস্তুত করে এবং আগাম বৃষ্টির অপেক্ষায় থাকে।

আষাঢ়

আষাঢ় বর্ষা ঋতুর প্রথম মাস। এই মাসে মৌসুমী বায়ু প্রবেশ করে এবং প্রথম প্রবল বৃষ্টিপাত শুরু হয়। শুষ্ক জমি সবুজ হয়ে ওঠে, নদ-নদীতে জলস্তর বাড়তে থাকে। কৃষকদের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময় কারণ আমন ধানের চারা রোপণ শুরু হয়। বৃষ্টির শীতলতা গ্রীষ্মের তাপ থেকে মুক্তি দেয় এবং প্রকৃতি নতুন জীবন লাভ করে। লোকসঙ্গীতে আষাঢ়ের বৃষ্টির বর্ণনা প্রচলিত। কখনো কখনো অতিবৃষ্টি ছোটখাটো বন্যার কারণ হয়, তবে সাধারণত এটি কৃষির জন্য আশীর্বাদস্বরূপ।

শ্রাবণ

শ্রাবণ বর্ষা ঋতুর শীর্ষ মাস, যখন বৃষ্টিপাত সর্বোচ্চ হয়। নদ-নদী, খাল-বিল উপচে পড়ে, প্রকৃতি গভীর সবুজে ঢাকা পড়ে। এই মাসে প্রায়ই বন্যা দেখা যায়, যা কৃষির জন্য উভয় আশীর্বাদ ও অভিশাপ। কৃষকরা ধানের পরিচর্যা করে। সাংস্কৃতিকভাবে শ্রাবণ রোমান্টিক মাস হিসেবে পরিচিত—লোকসঙ্গীত, রবীন্দ্রসঙ্গীত ও নজরুলগীতিতে বৃষ্টির বর্ণনা প্রচুর। হিন্দু সম্প্রদায়ে রথযাত্রা, ঝুলন যাত্রা উদযাপিত হয়। বৃষ্টির ছন্দে প্রকৃতি ও মানুষের জীবন এক অপূর্ব মিলন ঘটে।

ভাদ্র

ভাদ্র শরৎ ঋতুর প্রথম মাস। বর্ষার অবসানের সাথে আকাশ পরিষ্কার হয়, শুভ্র মেঘ ভেসে বেড়ায় এবং কাশফুলে মাঠ সাদা হয়ে যায়। এই মাসে জন্মাষ্টমী উদযাপিত হয় শ্রীকৃষ্ণের জন্মোৎসব হিসেবে। প্রকৃতি শরতের সৌন্দর্যে সেজে ওঠে, নদীর জল পরিষ্কার হয়। কৃষকরা ফসলের পরিচর্যা করে এবং আসন্ন দুর্গাপূজার প্রস্তুতি শুরু করে। শরতের মৃদু আবহাওয়া মানুষের মনে শান্তি এনে দেয় এবং কবি-সাহিত্যিকদের অনুপ্রেরণা যোগায়।

আশ্বিন

আশ্বিন শরৎ ঋতুর দ্বিতীয় মাস এবং বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজার মাস। পাঁচ দিনব্যাপী এই উৎসব দেবী দুর্গার বিজয় ও অশুভ শক্তির পরাজয়ের প্রতীক। সারা দেশে পূজামণ্ডপ স্থাপিত হয়, অপূর্ব প্রতিমা তৈরি হয়, আরতি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলে। কাশফুলের মাঠ, শরতের নীল আকাশ এবং মৃদু হাওয়া উৎসবের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয়। মুসলিম সম্প্রদায়ও এই উৎসবে অংশ নেয়, যা বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতিফলন।

কার্তিক

কার্তিক হেমন্ত ঋতুর প্রথম মাস। এই সময় ফসল কাটা শুরু হয় এবং শীতের আগমন ঘটে। হিন্দু সম্প্রদায়ে কার্তিক পূর্ণিমায় ভাইফোঁটা বা ভাইদুজ, লক্ষ্মীপূজা ও কালীপূজা উদযাপিত হয়। কৃষকরা ধান কেটে ঘরে তোলে, খামার ভরে ওঠে। আবহাওয়া মনোরম হয়, শীতের প্রথম শীতলতা অনুভূত হয়। গ্রামাঞ্চলে নতুন ধানের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে এবং অর্থনৈতিক সচ্ছলতা আসে।

অগ্রহায়ণ

অগ্রহায়ণ হেমন্ত ঋতুর শেষ মাস এবং নবান্ন উৎসবের মাস। নতুন ধান ঘরে ওঠার পর গ্রামে গ্রামে নবান্ন উদযাপন হয়—বিভিন্ন ধরনের পিঠে-পুলি তৈরি হয়, আত্মীয়-স্বজনের সাথে ভাগ করে খাওয়া হয়। এই মাসে কৃষকদের মুখে হাসি ফোটে কারণ বছরের পরিশ্রমের ফল লাভ করে। আবহাওয়া শীতল হয়, কুয়াশা পড়তে শুরু করে। নবান্ন বাঙালির কৃষি-নির্ভর সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান উৎসব।

পৌষ

পৌষ শীত ঋতুর প্রথম মাস। এই সময় শীতের তীব্রতা বাড়ে, কুয়াশা ঘন হয় এবং পিঠে-পুলির মৌসুম শুরু হয়। পৌষ সংক্রান্তিতে গ্রামে মেলা বসে, খেজুরের রস থেকে পাটালি, নলেন গুড় তৈরি হয়। বিভিন্ন ধরনের পিঠে—দুধপুলি, ভাপা, চিতই, পাটিসাপটা তৈরি করে পরিবারের সাথে উপভোগ করা হয়। গ্রামীণ জীবনে এই মাস আনন্দের, যদিও শীতের কারণে দিনমজুরদের কষ্ট হয়।

মাঘ

মাঘ শীত ঋতুর শেষ মাস। এই সময় শীত সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকে, ঘন কুয়াশা ও শীতল বাতাস প্রবাহিত হয়। গ্রামে কুয়াশায় ঢাকা মাঠের দৃশ্য অপূর্ব। মাঘী পূর্ণিমায় ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয়, কিছু অঞ্চলে স্নান ও দান করা হয়। শীতের ফসল যেমন সরিষা, শাকসবজি বাজারে আসে। শীতের অবসানের সাথে মানুষ বসন্তের অপেক্ষায় থাকে। এই মাস শীতপ্রেমীদের জন্য স্মরণীয়।

ফাল্গুন

ফাল্গুন বসন্ত ঋতুর প্রথম মাস। এই সময় প্রকৃতি রঙিন হয়ে ওঠে—নতুন পাতা, ফুলের সমারোহ, পাখির কলতান। পহেলা ফাল্গুন বসন্ত উৎসব হিসেবে উদযাপিত হয়, যেখানে হলুদ-লাল পোশাক, ফুলের অলংকার পরা হয়। ডল পূর্ণিমা বা হোলি উৎসবে রং খেলা হয়। বসন্তের মৃদু হাওয়া ও ফুলের সুবাস মানুষের মনে আনন্দ ছড়ায়। রবীন্দ্রনাথের বসন্তের গান এই ঋতুকে অমর করে রেখেছে।

চৈত্র

চৈত্র বসন্ত ঋতুর শেষ মাস এবং বাংলা বছরের শেষ মাস। এই সময় গরমের আগমন ঘটে, গাছে গাছে নতুন ফুল ফোটে কিন্তু শুষ্কতা বাড়ে। চৈত্র সংক্রান্তি বা চড়ক পূজা কিছু অঞ্চলে উদযাপিত হয়, যেখানে কঠিন সাধনা ও মেলা হয়। গ্রামে হালের গরু দিয়ে জমি চাষের শেষ প্রস্তুতি নেওয়া হয়। এই মাস বছরের সমাপ্তি এবং নতুন বছরের প্রতীক্ষার সময়। প্রকৃতিতে শুষ্কতা থাকলেও উৎসবের আমেজ থাকে।

ষড়ঋতুর বিস্তারিত বর্ণনা

বাংলা মাসের নামকরণের ইতিহাস

বাংলা সনের মাসগুলোর নামকরণ করা হয়েছে মূলত নক্ষত্রের নাম অনুসারে। প্রাচীন ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছিলেন যে, পূর্ণিমার রাতে চাঁদ যখন যে নক্ষত্রের কক্ষপথে অবস্থান করে, সেই নক্ষত্রের নামানুসারেই ওই মাসের নামকরণ করা হয়েছে। একে বলা হয় 'চান্দ্র-নক্ষত্র' পদ্ধতি।

বাংলা মাসের নামকরণের বৈজ্ঞানিক ও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ভিত্তি

বাংলা মাসের নামগুলো আকাশচুম্বী কল্পনা নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে নিখুঁত জ্যোতির্বিজ্ঞান (Astronomy)। প্রাচীন ভারতীয় জ্যোতির্বিদরা আকাশের বিস্তৃতিকে ২৭টি নক্ষত্রপুঞ্জে ভাগ করেছিলেন।

চাঁদ যখন পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে, তখন প্রতি পূর্ণিমার রাতে সে কোনো না কোনো নক্ষত্রের খুব কাছে অবস্থান করে। চাঁদ যে পূর্ণিমায় যে নক্ষত্রের পাশে থাকে, সেই নক্ষত্রটির নামানুসারে ওই মাসের নামকরণ করা হয়েছে। একে বলা হয় 'নাক্ষত্রিক মাস'

নক্ষত্র অনুযায়ী ১২ মাসের নামের অর্থ ও উৎস

নিচে একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকার মাধ্যমে মাসগুলোর নামকরণের উৎস তুলে ধরা হলো:

মাসসংশ্লিষ্ট নক্ষত্রনামের অর্থ ও তাৎপর্য
বৈশাখবিশাখা'বিশাখা' নক্ষত্র থেকে। এর অর্থ যার অনেক শাখা বা বিস্তৃতি রয়েছে।
জ্যৈষ্ঠজ্যেষ্ঠা'জ্যেষ্ঠা' নক্ষত্র থেকে। জ্যেষ্ঠা মানে জ্যেষ্ঠ বা বড়। গ্রীষ্মের তীব্রতায় এটি অগ্রগণ্য।
আষাঢ়আষাঢ়াপূর্বাষাঢ়া ও উত্তরাষাঢ়া নক্ষত্র থেকে। আষাঢ় শব্দের অর্থ যা অপরাজেয়।
শ্রাবণশ্রবণা'শ্রবণা' নক্ষত্র থেকে। এর আক্ষরিক অর্থ হলো 'শোনা' বা কানের আকৃতি বিশিষ্ট নক্ষত্রপুঞ্জ।
ভাদ্রভাদ্রপদাপূর্ব ও উত্তর ভাদ্রপদা নক্ষত্র থেকে। এর অর্থ সুন্দর বা কল্যাণময় পদ।
আশ্বিনঅশ্বিনী'অশ্বিনী' নক্ষত্র থেকে। অশ্বিনী মানে ঘোড়া, যা গতি ও শক্তির প্রতীক।
কার্তিককৃত্তিকা'কৃত্তিকা' নক্ষত্র থেকে। এটি দেবসেনাপতি কার্তিকেয় বা বীরত্বের সাথে যুক্ত।
অগ্রহায়ণমৃগশিরা'হায়ন' মানে বছর আর 'অগ্রহ' মানে শুরু। একসময় এই মাস দিয়েই বছর শুরু হতো।
পৌষপুষ্যা'পুষ্যা' নক্ষত্র থেকে। এর অর্থ পুষ্টি সাধনকারী বা লালনকারী।
মাঘমঘা'মঘা' নক্ষত্র থেকে। মঘা মানে ঐশ্বর্য বা দানশীলতা।
ফাল্গুনফাল্গুনীপূর্ব ও উত্তর ফাল্গুনী নক্ষত্র থেকে। এর অর্থ লাল আভা বা অর্জুন বৃক্ষ।
চৈত্রচিত্রা'চিত্রা' নক্ষত্র থেকে। চিত্রা মানে অদ্ভুত, সুন্দর বা বিচিত্র ছবি।

১২ মাসের নামের বিস্তারিত উৎপত্তি ও গভীর অর্থ

বৈশাখ: নক্ষত্র 'বিশাখা'

বাংলা বছরের প্রথম মাস বৈশাখ। এর নাম এসেছে বিশাখা নক্ষত্র থেকে। সংস্কৃত শব্দ 'বিশাখা'র অর্থ হলো যার অনেকগুলো শাখা আছে। বসন্তের শেষে এবং গ্রীষ্মের শুরুতে প্রকৃতির যে রূপান্তর, তা এই নক্ষত্রের অবস্থানের সাথে মিল রেখে নামকরণ করা হয়েছে।

জ্যৈষ্ঠ: নক্ষত্র 'জ্যেষ্ঠা'

জ্যৈষ্ঠ মাসের নাম এসেছে জ্যেষ্ঠা নক্ষত্র থেকে। জ্যেষ্ঠা শব্দের অর্থ হলো 'জ্যেষ্ঠ' বা বড়। এই সময়ে সূর্য উত্তর গোলার্ধের অনেকটা কাছে থাকে এবং দিন বড় হয়, যা এই নামের সার্থকতা বজায় রাখে।

আষাঢ়: নক্ষত্র 'আষাঢ়া' (পূর্বাষাঢ়া ও উত্তরাষাঢ়া)

বর্ষার শুরুর এই মাসটির নাম আষাঢ়া নক্ষত্রপুঞ্জ থেকে নেওয়া। আষাঢ় শব্দের অর্থ যা অপরাজেয় বা যাকে সহজে জয় করা যায় না। বর্ষার দুর্ধর্ষ রূপের সাথে এই নামের একটি গভীর মিল পাওয়া যায়।

শ্রাবণ: নক্ষত্র 'শ্রবণা'

শ্রাবণ মাসের নামকরণ হয়েছে শ্রবণা নক্ষত্র থেকে। 'শ্রবণা' শব্দের মূল অর্থ হলো শোনা বা শ্রবণ করা। মেঘের গর্জন এবং বৃষ্টির অবিরাম শব্দ শোনার মাস হিসেবেই হয়তো প্রাচীনকালে এই নামকরণটি জনপ্রিয় হয়েছিল।

ভাদ্র: নক্ষত্র 'ভাদ্রপদা'

ভাদ্র মাসের নাম এসেছে ভাদ্রপদা (পূর্ব ও উত্তর) নক্ষত্র থেকে। ভাদ্রপদা অর্থ হলো কল্যাণময়ী পদ বা পা। শরৎকালের আগমনের সংকেত দেয় এই মাসটি।

আশ্বিন: নক্ষত্র 'অশ্বিনী'

শারদীয় উৎসবের মাস আশ্বিনের নাম এসেছে অশ্বিনী নক্ষত্র থেকে। অশ্বিনী শব্দের অর্থ হলো ঘোড়া বা অশ্ব। এটি শক্তি, গতি এবং নবপ্রাণের প্রতীক হিসেবে পরিচিত।

কার্তিক: নক্ষত্র 'কৃত্তিকা'

কার্তিক মাসের নাম এসেছে কৃত্তিকা নক্ষত্র থেকে। হিন্দু পুরাণ মতে, কৃত্তিকা নক্ষত্রের অধিপতি হলেন দেবসেনাপতি কার্তিকেয়। এই মাসটি বীরত্ব এবং আধ্যাত্মিক সাধনার সাথে সম্পৃক্ত।

অগ্রহায়ণ: নক্ষত্র 'মৃগশিরা' ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব

অগ্রহায়ণ মাসের নামকরণ হয়েছে মৃগশিরা নক্ষত্র থেকে। তবে এর নামের পেছনে একটি ঐতিহাসিক তাৎপর্য আছে। 'অগ্রহায়ণ' শব্দটির সন্ধি বিচ্ছেদ করলে পাওয়া যায় অগ্র + হায়ন। 'অগ্র' মানে শুরু আর 'হায়ন' মানে বছর। প্রাচীনকালে এই মাসটিই ছিল বছরের প্রথম মাস।

পৌষ: নক্ষত্র 'পুষ্যা'

পৌষ মাসের নাম এসেছে পুষ্যা নক্ষত্র থেকে। পুষ্যা শব্দের অর্থ হলো পুষ্টকারী বা যা লালন-পালন করে। শীতকালীন ফসলের প্রাচুর্য এই নামের সার্থকতা তুলে ধরে।

মাঘ: নক্ষত্র 'মঘা'

মাঘ মাসের নাম এসেছে মঘা নক্ষত্র থেকে। মঘা শব্দের অর্থ হলো মহান বা রাজকীয়। এই মাসে সূর্য তার দক্ষিণায়ন শেষ করে উত্তর দিকে যাত্রা শুরু করে।

ফাল্গুন: নক্ষত্র 'ফাল্গুনী'

বসন্তের আগমন ঘটে এই মাসে। এর নাম এসেছে ফাল্গুনী (পূর্ব ও উত্তর) নক্ষত্র থেকে। ফাল্গুনী শব্দের অর্থ হলো লাল আভা বা অর্জুন বৃক্ষ। প্রকৃতির লাল পলাশ আর শিমুলের সাথে এই নামের চমৎকার মিল রয়েছে।

চৈত্র: নক্ষত্র 'চিত্রা'

বছরের শেষ মাস চৈত্রের নাম এসেছে চিত্রা নক্ষত্র থেকে। চিত্রা শব্দের অর্থ হলো বিচিত্র বা চমৎকার কোনো ছবি। বছরের শেষ প্রান্তে এসে প্রকৃতি যেন এক বিচিত্র সাজে সেজে ওঠে।

উপসংহার

বাংলা ক্যালেন্ডারের ১২টি মাস কেবল তারিখ নয়—এগুলো বাংলাদেশের কৃষি ছন্দ, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতিনিধিত্ব করে। পহেলা বৈশাখের উজ্জ্বল উদযাপন থেকে শীতের শান্ত সকাল পর্যন্ত, প্রতিটি মাস অনন্য অভিজ্ঞতা প্রদান করে যা বাঙালি পরিচয়কে সংজ্ঞায়িত করে চলেছে।

তথ্যসূত্র

  • উইকিপিডিয়া: বাংলা ক্যালেন্ডার
  • বাংলা তারিখ টুডে
  • বিউটিফুল বেঙ্গল: বাংলা ক্যালেন্ডার
  • বাংলাদেশী উৎসবের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক উৎস

Cookie Consent
We serve cookies on this site to analyze traffic, remember your preferences, and optimize your experience.
Oops!
It seems there is something wrong with your internet connection. Please connect to the internet and start browsing again.
AdBlock Detected!
We have detected that you are using adblocking plugin in your browser.
The revenue we earn by the advertisements is used to manage this website, we request you to whitelist our website in your adblocking plugin.
Site is Blocked
Sorry! This site is not available in your country.